মূল কন্টেন্টে যান

বাংলার সাথে

গ্যাজেট প্রযুক্তি

গ্যাজেটের আয়ু কমছে, মেরামতের অধিকার নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে

গ্যাজেটের আয়ু কমছে, মেরামতের অধিকার নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে

এক দশক আগেও একটি ইলেকট্রনিক যন্ত্র কেনা মানে ছিল বহু বছরের ব্যবহারের নিশ্চয়তা। এখন স্মার্টফোন, ল্যাপটপ কিংবা স্মার্টঘড়ির মতো পণ্যের ব্যবহারকাল ক্রমেই সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছে, আর নষ্ট হলে মেরামতের চেয়ে নতুন কেনাই অনেক ক্ষেত্রে সস্তা ঠেকছে। এই প্রবণতা ভোক্তার খরচ বাড়ানোর পাশাপাশি ইলেকট্রনিক বর্জ্যের পাহাড় তৈরি করছে। বিশ্বজুড়ে তাই মেরামতের অধিকার নিয়ে আলোচনা জোরালো হচ্ছে, যার কেন্দ্রে রয়েছে নকশা, যন্ত্রাংশের সহজলভ্যতা ও সফটওয়্যার সহায়তার প্রশ্ন। ক্রেতার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রশ্নটি সহজ, অর্থাৎ একটি যন্ত্র কত দিন নিরাপদে ও কার্যকরভাবে ব্যবহার করা যাবে, আর সেই উত্তরটিই সবচেয়ে কম স্বচ্ছভাবে জানানো হয়।

নকশাই যখন মেরামতের বাধা

আধুনিক গ্যাজেটে পাতলা ও হালকা গড়নের চাহিদা মেটাতে ব্যাটারি আঠা দিয়ে বসানো হয়, স্ক্রু কমিয়ে ক্লিপ ব্যবহার করা হয় এবং একাধিক উপাদান একটিই বোর্ডে যুক্ত করে দেওয়া হয়। ফলে একটি ছোট অংশ নষ্ট হলেও পুরো মডিউল বদলাতে হয়, যার খরচ প্রায় নতুন যন্ত্রের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ব্যবহারকারীর কাছে তখন মেরামত অযৌক্তিক মনে হয়, আর নির্মাতার দিক থেকেও নতুন বিক্রির চেয়ে মেরামতসেবা কম লাভজনক থেকে যায়। জলরোধী নকশার প্রয়োজনে সিলিং ব্যবহারও মেরামতকে কঠিন করে তোলে, কারণ একবার খোলা হলে সেই সুরক্ষা পুনরুদ্ধার করা দুরূহ।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যন্ত্রাংশ সরবরাহের সীমাবদ্ধতা। বহু নির্মাতা অনুমোদিত সেবাকেন্দ্রের বাইরে মূল যন্ত্রাংশ বা মেরামতের নির্দেশিকা সরবরাহ করে না, ফলে স্থানীয় মেরামতকারীরা বিকল্প বা পুনরুদ্ধার করা অংশের ওপর নির্ভর করেন। এতে মেরামতের মান অনিশ্চিত হয়ে পড়ে এবং ভোক্তার আস্থা কমে। কিছু ক্ষেত্রে যন্ত্রাংশ বদলালে সফটওয়্যার তা শনাক্ত করে কিছু সুবিধা বন্ধ করে দেয়, যা মেরামতকে আরও নিরুৎসাহিত করে।

বিজ্ঞাপনখবরের মাঝে বিজ্ঞাপন

সফটওয়্যার সহায়তার মেয়াদ

একটি যন্ত্র শারীরিকভাবে সচল থাকলেও নিরাপত্তা হালনাগাদ বন্ধ হয়ে গেলে তা কার্যত ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ে। ব্যাংকিং বা পরিচয় যাচাইয়ের মতো সংবেদনশীল অ্যাপ পুরোনো সংস্করণে চলতে অস্বীকার করে, আর অনাবিষ্কৃত নিরাপত্তা ত্রুটি অপরিবর্তিত থেকে যায়। অর্থাৎ পণ্যের প্রকৃত আয়ু নির্ধারণ করে হার্ডওয়্যার নয়, সফটওয়্যার সহায়তার মেয়াদ। অপারেটিং সিস্টেমের নতুন সংস্করণ পুরোনো হার্ডওয়্যারে ভারী হয়ে পড়ায় যন্ত্র ধীর হয়ে যাওয়ার অভিযোগও সাধারণ, যা ব্যবহারকারীকে অকালে নতুন কেনার দিকে ঠেলে দেয়।

এই কারণেই ক্রয়ের সময় সহায়তার মেয়াদ সম্পর্কে স্পষ্ট ঘোষণা থাকা জরুরি হয়ে উঠেছে। কয়েকটি বাজারে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো নির্মাতাদের ন্যূনতম সময় পর্যন্ত হালনাগাদ ও যন্ত্রাংশ সরবরাহে বাধ্য করার দিকে এগোচ্ছে, যদিও এর বাস্তবায়ন ও নজরদারি নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। ভোক্তার জন্য আপাতত সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা হলো কেনার আগে ব্র্যান্ডের অতীত আচরণ যাচাই করা, অর্থাৎ আগের মডেলগুলোতে কত দিন হালনাগাদ দেওয়া হয়েছিল তা দেখা।

বর্জ্য ও স্থানীয় বাজারের চাপ

বাতিল হওয়া ইলেকট্রনিক পণ্যে সিসা, পারদ ও নানা ভারী ধাতু থাকে, যা অব্যবস্থাপনায় মাটি ও পানিতে মিশে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই বর্জ্যের বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে ভাঙা হয়, যেখানে শ্রমিকেরা প্রায়ই ন্যূনতম সুরক্ষা ছাড়াই কাজ করেন। অথচ এই বর্জ্যেই থাকে তামা ও মূল্যবান ধাতু, যা সুসংগঠিত পুনর্ব্যবহারে উদ্ধার করা সম্ভব। পুনর্ব্যবহারের সুসংগঠিত ব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে এটি একটি নিয়মিত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে পরিণত হতে পারে, যেখানে শ্রমিকের সুরক্ষাও নিশ্চিত করা সম্ভব।

অন্যদিকে স্থানীয় মেরামত খাত বহু মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস এবং সীমিত আয়ের ভোক্তার জন্য যন্ত্র সচল রাখার একমাত্র বাস্তব উপায়। মূল যন্ত্রাংশ ও কারিগরি তথ্যের প্রবেশাধিকার সহজ হলে এই খাতের মান বাড়ে, ভোক্তার খরচ কমে এবং বর্জ্যের চাপও হ্রাস পায়। বিষয়টি তাই কেবল পরিবেশের নয়, অর্থনীতিরও প্রশ্ন। সেকেন্ড-হ্যান্ড বাজারের বিস্তারও এই প্রেক্ষাপটে ইতিবাচক, কারণ এতে একটি যন্ত্রের ব্যবহারকাল কার্যত দীর্ঘায়িত হয়।

ভোক্তা পর্যায়ে সচেতনতা এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কেনার আগে ব্যাটারি বদলানো যায় কি না, যন্ত্রাংশ পাওয়া যাবে কি না এবং হালনাগাদ কত দিন মিলবে, এই প্রশ্নগুলো বিবেচনায় নিলে বাজারে ধীরে ধীরে টেকসই নকশার চাহিদা তৈরি হয়। নীতিনির্ধারণ, নির্মাতার দায়বদ্ধতা ও ক্রেতার পছন্দ, এই তিন দিক একসঙ্গে না এগোলে গ্যাজেটের সংক্ষিপ্ত আয়ুর প্রবণতা সহজে বদলাবে না।

admin

লেখক সম্পর্কে

সম্পর্কিত খবর

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার ও শ্রমবাজারের নতুন সমীকরণ
AI ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি প্রযুক্তি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার ও শ্রমবাজারের নতুন সমীকরণ

  • ১৮ জুলাই, ২০২৬
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর গবেষণাগারের সীমানায় আবদ্ধ কোনো ধারণা নয়। লেখালেখি, ছবি তৈরি, কোড লেখা কিংবা গ্রাহকসেবার মতো কাজে এই
সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর কাঠামোগত কারণ ও প্রতিকার
প্রযুক্তি সোশ্যাল মিডিয়া

সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর কাঠামোগত কারণ ও প্রতিকার

  • ১৮ জুলাই, ২০২৬
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথ্যপ্রবাহকে গণতান্ত্রিক করেছে, একই সঙ্গে অসত্য তথ্য ছড়ানোর গতিও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, স্বাস্থ্যবিষয়ক ভ্রান্ত ধারণা