মূল কন্টেন্টে যান

বাংলার সাথে

আবহাওয়া

তাপ ও আর্দ্রতা যেভাবে শরীর ও কাজের ওপর প্রভাব ফেলে

তাপ ও আর্দ্রতা যেভাবে শরীর ও কাজের ওপর প্রভাব ফেলে
তাপ ও আর্দ্রতা যেভাবে শরীর ও কাজের ওপর প্রভাব ফেলে

গরমের অনুভূতি কেবল তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে না—আর্দ্রতা এখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশের মতো আর্দ্র গ্রীষ্মমণ্ডলীয় জলবায়ুতে বাতাসে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেশি থাকায় শরীরের স্বাভাবিক শীতলীকরণ প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ফলে একই তাপমাত্রা শুষ্ক অঞ্চলের তুলনায় এখানে অনেক বেশি কষ্টকর মনে হয়। এই শারীরবৃত্তীয় বাস্তবতা শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা থেকে শুরু করে শিশু ও প্রবীণদের স্বাস্থ্য—সবকিছুর সঙ্গে জড়িত।

শরীর কীভাবে তাপ সামলায়

মানবদেহ ভেতরের তাপমাত্রা একটি সংকীর্ণ সীমার মধ্যে ধরে রাখার চেষ্টা করে। বাইরের তাপ বাড়লে ত্বকের রক্তনালি প্রসারিত হয় এবং ঘাম নিঃসরণ বাড়ে। ঘাম ত্বকের পৃষ্ঠ থেকে বাষ্পীভূত হওয়ার সময় শরীর থেকে তাপ নিয়ে যায়—এটিই প্রধান শীতলীকরণ কৌশল।

সমস্যা হলো, বাতাস যখন আর্দ্রতায় প্রায় সম্পৃক্ত থাকে, তখন ঘাম সহজে বাষ্পীভূত হয় না। ঘাম গায়ে জমে থাকে, শরীর তাপ হারাতে পারে না, অথচ পানি ও লবণ ক্ষয় হতেই থাকে। এই অবস্থায় পানিশূন্যতা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, মাথা ঘোরা ও পেশিতে খিঁচুনির মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। পরিস্থিতি গুরুতর হলে তা জরুরি চিকিৎসার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

বিজ্ঞাপনখবরের মাঝে বিজ্ঞাপন

কারা বেশি ঝুঁকিতে

তাপজনিত ঝুঁকি সবার জন্য সমান নয়। শিশুদের শরীরের ওজনের তুলনায় ত্বকের ক্ষেত্রফল বেশি এবং তাপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা পূর্ণ বিকশিত নয়। প্রবীণদের ক্ষেত্রে তৃষ্ণার অনুভূতি কমে যেতে পারে এবং অনেকে এমন দীর্ঘস্থায়ী রোগে ভোগেন বা ওষুধ নেন, যা তাপ সহনশীলতাকে প্রভাবিত করে। গর্ভবতী নারী এবং হৃদরোগ, কিডনি বা শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিরাও অতিরিক্ত সতর্কতার প্রয়োজন বোধ করেন।

পেশাগত ঝুঁকিও উল্লেখযোগ্য। রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, হকার কিংবা যাঁরা তাপ উৎপাদনকারী কারখানায় কাজ করেন—তাঁদের সরাসরি তাপের সংস্পর্শে থাকতে হয় এবং অনেক সময় বিশ্রাম বা ছায়ার সুযোগ সীমিত থাকে। শহরে কংক্রিট ও পিচঢালা পৃষ্ঠ দিনের তাপ শোষণ করে রাতে ছাড়ে বলে নগরকেন্দ্র আশপাশের এলাকার তুলনায় বেশি উষ্ণ থাকে—এই ঘটনাকে বলা হয় নগর তাপদ্বীপ প্রভাব।

সহনীয় রাখার উপায়

গরমের সময় সাধারণ কিছু সতর্কতা কাজে দেয়। নিয়মিত বিরতিতে পানি পান করা—তৃষ্ণা পাওয়ার অপেক্ষা না করে—সবচেয়ে মৌলিক পরামর্শ। দিনের সবচেয়ে উত্তপ্ত সময়ে ভারী পরিশ্রম এড়ানো, হালকা রঙের ঢিলেঢালা সুতির পোশাক পরা, ছায়ায় নিয়মিত বিশ্রাম নেওয়া এবং ঘরে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা রাখা—এসব সহজ পদক্ষেপ ঝুঁকি অনেকটা কমায়।

কর্মক্ষেত্রেও কিছু ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে, যেমন কাজের সময়সূচি সমন্বয় করা, পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা রাখা এবং ছায়াযুক্ত বিশ্রামের জায়গা নিশ্চিত করা। কারও মধ্যে বিভ্রান্তি, ঘাম বন্ধ হয়ে যাওয়া, প্রচণ্ড মাথাব্যথা বা জ্ঞান হারানোর লক্ষণ দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসাসেবা নেওয়া প্রয়োজন—এসব গুরুতর সতর্কসংকেত হতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে তাপ ব্যবস্থাপনা কেবল ব্যক্তিগত সতর্কতার বিষয় থাকছে না; এটি নগর পরিকল্পনা, শ্রমনীতি ও জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন হয়ে উঠছে। সবুজ আচ্ছাদন বাড়ানো, ছায়াযুক্ত পথচারী অবকাঠামো এবং তাপ-সহনশীল ভবন নকশা—এসব দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আগামী দিনের শহরগুলোর জন্য ক্রমেই অপরিহার্য হয়ে উঠছে।