
সাক্ষাৎকার সাংবাদিকতার সবচেয়ে পুরোনো ও সবচেয়ে ভুল বোঝা শাখাগুলোর একটি। বাইরে থেকে দেখলে মনে হয়, কাজটি সহজ—কয়েকটি প্রশ্ন, কিছু উত্তর, তারপর লিপিবদ্ধ করা। বাস্তবে একটি ভালো সাক্ষাৎকার তৈরি হয় দীর্ঘ প্রস্তুতি, মনোযোগী শ্রবণ ও কঠোর সম্পাদনার ভেতর দিয়ে। বাংলা গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকারের একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য আছে, কিন্তু সেই ঐতিহ্য ধরে রাখতে হলে এর কারিগরি ও নৈতিক দিকগুলো নিয়ে নিয়মিত আলোচনা প্রয়োজন।
প্রস্তুতিই সাক্ষাৎকারের অর্ধেক
যে সাংবাদিক আগে থেকে বিষয়টি সম্পর্কে পড়াশোনা করেন না, তিনি সাক্ষাৎকার গ্রহীতার কাছে কার্যত একজন শ্রোতায় পরিণত হন। প্রস্তুতির অর্থ কেবল জীবনবৃত্তান্ত জানা নয়; বরং সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিতর্ক, ভিন্নমত ও অমীমাংসিত প্রশ্নগুলো সম্পর্কে ধারণা রাখা। এই প্রস্তুতিই সাংবাদিককে সেই আত্মবিশ্বাস দেয়, যা দিয়ে তিনি এড়িয়ে যাওয়া উত্তরের পর দ্বিতীয় প্রশ্নটি করতে পারেন।
প্রশ্ন সাজানোর ক্রমও গুরুত্বপূর্ণ। শুরুতেই সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি ছুড়ে দিলে কথোপকথন বন্ধ হয়ে যেতে পারে; আবার কঠিন প্রশ্ন একেবারে না করলে সাক্ষাৎকার প্রচারণায় রূপ নেয়। অভিজ্ঞ সাক্ষাৎকারগ্রহীতা এই ভারসাম্যটি বোঝেন এবং কথোপকথনের গতি অনুযায়ী নিজের তালিকা থেকে সরে আসতেও দ্বিধা করেন না।
উদ্ধৃতির নৈতিকতা
সাক্ষাৎকারের সবচেয়ে সংবেদনশীল অংশ হলো উদ্ধৃতি। কারও বক্তব্য সংক্ষিপ্ত করার প্রয়োজন হতেই পারে, কিন্তু সেই সংক্ষেপণ যেন অর্থ বদলে না দেয়। প্রসঙ্গ থেকে বিচ্ছিন্ন একটি বাক্য কীভাবে সম্পূর্ণ ভিন্ন বার্তা তৈরি করতে পারে, তা যেকোনো অভিজ্ঞ সম্পাদক জানেন। তাই সম্পাদনার সময় মূল বক্তব্যের অভিপ্রায় রক্ষা করাই প্রধান দায়িত্ব।
একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো স্বচ্ছতা—কথোপকথন রেকর্ড হচ্ছে কি না, কোন অংশ প্রকাশিত হবে, কোনো শর্ত আছে কি না, এসব আগেই স্পষ্ট করে নেওয়া উচিত। পাঠকের প্রতি সততা রক্ষা করতে হলে সাক্ষাৎকারদাতার প্রতিও সততা রাখতে হয়। এই দুই দায়িত্বের মধ্যে কোনো বিরোধ নেই; বরং একটি অন্যটিকে শক্তি জোগায়।
প্রেক্ষাপট ছাড়া উত্তরের মূল্য কম
একটি সাক্ষাৎকার তখনই পাঠকের কাজে আসে, যখন তার সঙ্গে যথাযথ প্রেক্ষাপট যুক্ত থাকে। কে বলছেন, কোন অবস্থান থেকে বলছেন, বিষয়টিতে তাঁর স্বার্থ আছে কি না—এসব তথ্য ছাড়া পাঠক বক্তব্যের ওজন বুঝতে পারেন না। ভালো সাক্ষাৎকার তাই কেবল প্রশ্নোত্তর নয়, একধরনের ব্যাখ্যামূলক কাঠামো, যা পাঠককে নিজের সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে সাহায্য করে।
শেষ পর্যন্ত সাক্ষাৎকারের মূল্য নির্ভর করে কৌতূহলের সততার ওপর। যে সাংবাদিক সত্যিই জানতে চান, তাঁর প্রশ্নে সেই আগ্রহ ধরা পড়ে এবং উত্তরদাতাও খোলামেলা হন। বাংলা সংবাদমাধ্যমে এই ধরনের মনোযোগী, প্রস্তুত ও নীতিনিষ্ঠ সাক্ষাৎকারের চর্চা বাড়লে জনপরিসরের আলোচনাও সমৃদ্ধ হবে। আমরা সেই মানদণ্ড ধরে রাখার চেষ্টাতেই বিশ্বাসী।


