মূল কন্টেন্টে যান

বাংলার সাথে

কলাম মতামত

শহরের কোলাহলে হারিয়ে যাওয়া ধৈর্যের সংস্কৃতি

শহরের কোলাহলে হারিয়ে যাওয়া ধৈর্যের সংস্কৃতি

ইদানীং মনে হয়, আমরা সবাই কোথাও একটা পৌঁছানোর তাড়ায় আছি, অথচ গন্তব্যটা কী তা স্পষ্ট নয়। সকালবেলা রাস্তায় নামলে হর্নের শব্দে যে অসহিষ্ণুতা প্রকাশ পায়, তা কেবল যানজটের বিরক্তি নয়—তার ভেতরে জমে থাকে দীর্ঘদিনের ক্লান্তি ও অনিশ্চয়তা। ধৈর্য নামের যে গুণটিকে আমাদের সমাজ একসময় বড় মূল্য দিত, তা আজ প্রায় দুর্বলতার সমার্থক হয়ে উঠেছে। এই পরিবর্তনটি নিছক ব্যক্তিগত স্বভাবের বিষয় নয়; এর পেছনে আছে জীবনযাপনের কাঠামোগত রূপান্তর।

গতির অর্থনীতি ও মানুষের মন

আধুনিক নাগরিক জীবনে সময়কে মাপা হয় উৎপাদনশীলতার একক দিয়ে। যে সময় কোনো দৃশ্যমান ফল দেয় না, তাকে আমরা অপচয় বলে ধরে নিই। ফলে অপেক্ষা, বিরতি কিংবা নিছক নিরুদ্দেশ ভাবনা—এসব ক্রমেই সন্দেহজনক হয়ে উঠেছে। অথচ মানুষের চিন্তা পরিণত হয় ধীরে, আর সিদ্ধান্তের গভীরতা আসে থেমে ভাবার সুযোগ থেকে।

প্রযুক্তি এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করেছে। হাতের যন্ত্রটি প্রতিটি ফাঁকা মুহূর্তকে ভরাট করে দেয় বলে আমরা আর নিজের সঙ্গে একা থাকার অভ্যাসটাই হারিয়ে ফেলছি। তাৎক্ষণিক উত্তর, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও তাৎক্ষণিক বিচারের অভ্যাস আমাদের ভাবনাকে অগভীর করে তুলছে। যেখানে বোঝাপড়া দরকার, সেখানে আমরা মতামত দিয়ে ফেলি; যেখানে শোনা দরকার, সেখানে বলে ফেলি।

বিজ্ঞাপনখবরের মাঝে বিজ্ঞাপন

পরিবার ও প্রতিবেশের বদলে যাওয়া ছন্দ

একান্নবর্তী পরিবারের কাঠামো ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ধৈর্য শেখার প্রাথমিক পাঠশালাটিও দুর্বল হয়েছে। ভিন্ন বয়সের মানুষের সঙ্গে একই ছাদের নিচে থাকা মানে ছিল প্রতিনিয়ত সমঝোতা শেখা—কখন চুপ থাকতে হয়, কখন ছাড় দিতে হয়। শহুরে ছোট পরিসরে সেই শিক্ষার সুযোগ সংকুচিত। প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কও এখন অনেকটা আনুষ্ঠানিক, ফলে ভিন্নমত সামলানোর অনুশীলন কমে গেছে।

এর প্রভাব দেখা যায় জনপরিসরে। সামান্য মতপার্থক্যে যে উত্তাপ তৈরি হয়, তা ইঙ্গিত দেয় আমরা দ্বিমতকে সহাবস্থানের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখতে অভ্যস্ত নই। অথচ বৈচিত্র্যময় সমাজে ভিন্নমতই স্বাভাবিক অবস্থা, ঐকমত্য বরং ব্যতিক্রম।

ধীরতাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা

ধৈর্য ফিরিয়ে আনার কাজটি বিশাল কোনো সংস্কার দিয়ে শুরু হয় না। এটি শুরু হতে পারে ছোট ছোট সিদ্ধান্ত থেকে—কথোপকথনের মাঝপথে বাধা না দেওয়া, কোনো খবর পড়ামাত্র মন্তব্য না করে একদিন অপেক্ষা করা, সন্তানের প্রশ্নের উত্তর তাড়াহুড়ো না করে দেওয়া। এসব সামান্য অভ্যাস সময়ের সঙ্গে চরিত্র গড়ে তোলে।

আমি মনে করি, ধৈর্য কোনো নিষ্ক্রিয়তা নয়; এটি এক সক্রিয় সংযম, যা বিচারবুদ্ধিকে কাজ করার অবকাশ দেয়। যে সমাজ ধীরে ভাবতে শেখে, সে সমাজ ভুল কম করে এবং ভুল হলে তা স্বীকার করতেও কম দ্বিধা করে। কোলাহল কমানো আমাদের হাতে সবসময় থাকে না, কিন্তু কোলাহলের ভেতরে নিজের ভেতরকার নীরবতাটুকু রক্ষা করা এখনো সম্ভব। সেই নীরবতাই হয়তো আমাদের সবচেয়ে জরুরি নাগরিক সম্পদ।

admin

লেখক সম্পর্কে

সম্পর্কিত খবর

পাঠকের চিঠি বিভাগ সম্পর্কে সম্পাদকীয় কিছু কথা
চিঠি মতামত

পাঠকের চিঠি বিভাগ সম্পর্কে সম্পাদকীয় কিছু কথা

  • ২০ জুলাই, ২০২৬
সংবাদপত্রের পাতায় পাঠকের চিঠির জায়গাটি আকারে ছোট হলেও গুরুত্বে কম নয়। এটি সেই একমাত্র পরিসর, যেখানে সংবাদমাধ্যম কথা বলে না,
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে উদাসীনতা আর গ্রহণযোগ্য নয়
প্রতিক্রিয়া মতামত

সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে উদাসীনতা আর গ্রহণযোগ্য নয়

  • ২০ জুলাই, ২০২৬
সড়কে প্রাণহানির খবর আমাদের দৈনন্দিন সংবাদপাঠের এমন এক নিয়মিত অংশ হয়ে গেছে যে অনেক সময় তা আর আলাদা করে নাড়া