মূল কন্টেন্টে যান

বাংলার সাথে

প্রযুক্তি সোশ্যাল মিডিয়া

সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর কাঠামোগত কারণ ও প্রতিকার

সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়ানোর কাঠামোগত কারণ ও প্রতিকার

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তথ্যপ্রবাহকে গণতান্ত্রিক করেছে, একই সঙ্গে অসত্য তথ্য ছড়ানোর গতিও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, স্বাস্থ্যবিষয়ক ভ্রান্ত ধারণা কিংবা আর্থিক প্রতারণার বহু ঘটনার সূত্রপাত হয়েছে অনলাইনে ছড়ানো যাচাইহীন বার্তা থেকে। এই সমস্যাকে কেবল কিছু বিভ্রান্ত ব্যবহারকারীর কাজ হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত চরিত্র বোঝা যায় না। গুজবের বিস্তারে প্ল্যাটফর্মের নকশা, মানুষের মনস্তত্ত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক শূন্যতা, তিনটিরই ভূমিকা রয়েছে। একটি বার্তা কতজন দেখলেন, তার চেয়ে বড় প্রশ্ন হলো সেই বার্তাটি কীভাবে ও কেন এত মানুষের কাছে পৌঁছাল।

মনোযোগভিত্তিক নকশার প্রভাব

অধিকাংশ প্ল্যাটফর্মের আয় নির্ভর করে ব্যবহারকারী কতক্ষণ সেখানে থাকছেন তার ওপর। ফলে কনটেন্ট বাছাইয়ের অ্যালগরিদম এমন পোস্টকে অগ্রাধিকার দেয়, যা দ্রুত প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। ক্ষোভ, ভয় বা বিস্ময় জাগানো বার্তা স্বভাবতই বেশি মন্তব্য ও শেয়ার পায়, আর সংযত ও পরিমিত তথ্য তুলনামূলক কম মনোযোগ পায়। এই কাঠামোয় উত্তেজক অসত্য তথ্য অজান্তেই বাড়তি সুবিধা পেয়ে যায়, কারণ সত্যতা যাচাই কোনো পর্যায়েই বিতরণের পূর্বশর্ত নয়। ব্যবহারকারীর দিক থেকেও একটি মনস্তাত্ত্বিক প্রবণতা কাজ করে, তা হলো নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে মেলে এমন তথ্যকে সহজে গ্রহণ করা এবং বিপরীত তথ্যকে সন্দেহ করা।

বন্ধ বার্তা আদানপ্রদানের গ্রুপগুলোতে সমস্যাটি আরেক রূপ নেয়। সেখানে বার্তা আসে পরিচিতজনের কাছ থেকে, ফলে বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নাতীত বলে ধরে নেওয়া হয় এবং যাচাইয়ের প্রবণতা কমে যায়। উৎস অস্পষ্ট থাকায় সংশোধনী পৌঁছানোও কঠিন হয়। একটি ভুল বার্তা যত দ্রুত ছড়ায়, তার খণ্ডন সাধারণত তার ভগ্নাংশ পরিমাণ মানুষের কাছেই পৌঁছায়।

বিজ্ঞাপনখবরের মাঝে বিজ্ঞাপন

যাচাইয়ের অভ্যাস ও গণমাধ্যম শিক্ষা

গুজব প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং ব্যবহারকারীর যাচাই করার অভ্যাস। একটি পোস্ট শেয়ার করার আগে উৎস কে, কবে প্রকাশিত, ছবিটি সত্যিই সাম্প্রতিক কি না এবং স্বীকৃত সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি এসেছে কি না, এই কয়েকটি প্রশ্ন বহু বিভ্রান্তি ঠেকিয়ে দিতে পারে। পুরোনো ছবি বা ভিন্ন প্রেক্ষাপটের ভিডিওকে নতুন ঘটনার প্রমাণ হিসেবে চালিয়ে দেওয়া গুজব ছড়ানোর সবচেয়ে প্রচলিত কৌশল। সবচেয়ে কার্যকর সংশোধনী হলো দ্রুত ও স্পষ্ট ভাষায় দেওয়া খণ্ডন, যেখানে ভুল দাবিটি পুনরাবৃত্তি না করে সঠিক তথ্য সামনে আনা হয়।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি ছবি, কণ্ঠ ও ভিডিও এই চ্যালেঞ্জকে আরও কঠিন করে তুলেছে। এখন দৃশ্যমান প্রমাণও স্বতঃসিদ্ধ নয়, ফলে উৎস যাচাইয়ের গুরুত্ব আগের চেয়ে অনেক বেশি। স্কুল ও কলেজ পর্যায়ে গণমাধ্যম সাক্ষরতা পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করা তাই দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অংশ হতে পারে, যেখানে শিক্ষার্থী তথ্য গ্রহণের আগে প্রশ্ন করতে শিখবে।

নিয়ন্ত্রণ ও মতপ্রকাশের ভারসাম্য

রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ এই আলোচনার সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক। অসত্য তথ্য দমনের নামে প্রণীত আইন প্রায়ই এতটাই বিস্তৃত ভাষায় লেখা হয় যে সমালোচনা ও সাংবাদিকতাও তার আওতায় পড়ে যায়। ফলে গুজব কমার বদলে আত্মনিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি তৈরি হয়, আর নির্ভরযোগ্য তথ্যের সরবরাহ সংকুচিত হয়ে পড়ে। প্ল্যাটফর্মগুলোর দিক থেকেও কিছু কারিগরি পদক্ষেপ সম্ভব, যেমন বহুবার ফরোয়ার্ড হওয়া বার্তা চিহ্নিত করা কিংবা দ্রুত ছড়ানো পোস্টে বাড়তি যাচাইয়ের স্তর যুক্ত করা।

বাস্তবে অসত্য তথ্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে টেকসই প্রতিরোধ হলো সত্য তথ্যের দ্রুত ও স্বচ্ছ সরবরাহ। কর্তৃপক্ষ যদি সময়মতো নির্ভুল তথ্য প্রকাশ না করে, শূন্যস্থান পূরণ করে অনুমান ও গুজব। স্বাধীন তথ্যযাচাই উদ্যোগ, দায়িত্বশীল সংবাদমাধ্যম ও প্ল্যাটফর্মের স্বচ্ছ নীতিমালা, এই তিনের সমন্বয়ই কার্যকর পথ। স্থানীয় ভাষায় তথ্যযাচাই সেবার সংখ্যা বাড়ানো এবং সেগুলোর কাজের পদ্ধতি প্রকাশ্য রাখা এই প্রক্রিয়ায় আস্থা তৈরি করে।

সামগ্রিকভাবে সামাজিক মাধ্যমকে সমস্যার একমাত্র উৎস বা একমাত্র সমাধান, কোনোটিই ভাবা ঠিক হবে না। প্ল্যাটফর্মের দায়বদ্ধতা বাড়ানো, ব্যবহারকারীর সমালোচনামূলক পাঠদক্ষতা গড়ে তোলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যপ্রবাহ উন্মুক্ত রাখা, এই তিন স্তরে একযোগে কাজ না হলে গুজবের চক্র ভাঙা কঠিন। প্রযুক্তি বদলাবে, কিন্তু যাচাই করার অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সুরক্ষা হয়ে থাকবে।

admin

লেখক সম্পর্কে

সম্পর্কিত খবর

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার ও শ্রমবাজারের নতুন সমীকরণ
AI ও ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি প্রযুক্তি

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তার ও শ্রমবাজারের নতুন সমীকরণ

  • ১৮ জুলাই, ২০২৬
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন আর গবেষণাগারের সীমানায় আবদ্ধ কোনো ধারণা নয়। লেখালেখি, ছবি তৈরি, কোড লেখা কিংবা গ্রাহকসেবার মতো কাজে এই
ইন্টারনেট গতি ও নির্ভরযোগ্যতার পেছনের অবকাঠামোগত বাস্তবতা
ইন্টারনেট প্রযুক্তি

ইন্টারনেট গতি ও নির্ভরযোগ্যতার পেছনের অবকাঠামোগত বাস্তবতা

  • ১৮ জুলাই, ২০২৬
ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর কাছে সেবার মান সাধারণত একটি সংখ্যায় নেমে আসে, তা হলো গতি। কিন্তু বাস্তবে একটি ওয়েবপেজ কত দ্রুত খুলবে