
একটি রাষ্ট্রের সক্ষমতা কেবল সেতু, সড়ক বা ভবনের সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। জনগণের অর্থে পরিচালিত প্রতিটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে সিদ্ধান্ত নেয়, সেই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা কার কাছে দেয় এবং ভুল হলে কে দায় নেয়—এই প্রশ্নগুলোর উত্তরের ভেতরেই লুকিয়ে থাকে প্রকৃত উন্নয়নের মানদণ্ড। জবাবদিহি কোনো আনুষ্ঠানিক শোভাবর্ধন নয়; এটি সুশাসনের মেরুদণ্ড। যেখানে দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি দুর্বল, সেখানে সাময়িক অগ্রগতি দেখা গেলেও তা দীর্ঘমেয়াদে ভঙ্গুর প্রমাণিত হয়। আমরা মনে করি, বাংলাদেশের আগামী দিনের সবচেয়ে জরুরি কাজ প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির ভিতটি মজবুত করা।
স্বচ্ছতা কোনো অনুগ্রহ নয়, নাগরিকের অধিকার
সরকারি ব্যয়ের হিসাব, প্রকল্পের অগ্রগতি কিংবা সেবা প্রদানের মানদণ্ড—এসব তথ্য নাগরিকের কাছে পৌঁছানো কোনো দয়ার বিষয় নয়। করদাতার অর্থে যে কাজ হয়, সেই কাজের বিবরণ জানার অধিকার তার জন্মগত। তথ্য গোপন রাখার প্রবণতা যত বাড়ে, অপচয় ও অনিয়মের সুযোগও তত প্রসারিত হয়। বিপরীতে, তথ্য যখন সহজলভ্য থাকে, তখন প্রতিটি স্তরে সতর্কতা তৈরি হয়।
স্বচ্ছতার আরেকটি দিক আছে, যা কম আলোচিত। যে প্রতিষ্ঠান নিজের কাজের হিসাব নিয়মিত প্রকাশ করে, সে প্রতিষ্ঠান নিজেই নিজের ভুল আগেভাগে ধরতে পারে। ফলে স্বচ্ছতা কেবল বাইরের নজরদারির হাতিয়ার নয়, ভেতরের সংশোধনেরও উপায়। এই উপলব্ধি প্রশাসনিক সংস্কৃতির অংশ হয়ে উঠলে আস্থার সংকট অনেকটাই কমে আসে।
প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি বনাম ব্যক্তিনির্ভরতা
আমাদের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতায় একটি সাধারণ প্রবণতা লক্ষণীয়—ভালো ফল অনেক সময় নির্ভর করে কোনো একজন সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তার ওপর। তিনি বদলি হলে সেই সাফল্যও মিলিয়ে যায়। এটি প্রমাণ করে যে ব্যবস্থাটি ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল, প্রক্রিয়ার ওপর নয়। টেকসই শাসনের জন্য প্রয়োজন এমন কাঠামো, যেখানে কে দায়িত্বে আছেন তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নিয়ম ও পদ্ধতি।
প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি তৈরি হয় ধারাবাহিকতা থেকে। নিরীক্ষার সুপারিশ বাস্তবায়িত হচ্ছে কি না, অভিযোগ নিষ্পত্তির নির্দিষ্ট সময়সীমা মানা হচ্ছে কি না, কর্মকর্তাদের মূল্যায়নে ফলাফলের ওজন আছে কি না—এই প্রশ্নগুলোর নিয়মিত উত্তর খোঁজাই প্রাতিষ্ঠানিকতার চর্চা। একবারের সংস্কার ঘোষণা যথেষ্ট নয়; দরকার প্রতিদিনের অনুশীলন।
গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের ভূমিকা
জবাবদিহির বৃত্তটি সম্পূর্ণ হয় তখনই, যখন প্রশ্ন করার স্বাধীন পরিসর থাকে। গণমাধ্যম, গবেষক, পেশাজীবী সংগঠন ও সাধারণ নাগরিক—সবার অংশগ্রহণে গড়ে ওঠে এমন এক পরিবেশ, যেখানে ভুল আড়াল করা কঠিন হয়ে পড়ে। সমালোচনাকে বৈরিতা হিসেবে না দেখে সংশোধনের সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করার মানসিকতা রাষ্ট্রকে দুর্বল নয়, বরং পরিণত করে তোলে।
আমরা বিশ্বাস করি, জবাবদিহির প্রশ্নটি কোনো নির্দিষ্ট সময় বা প্রেক্ষাপটের নয়—এটি অব্যাহত নাগরিক দাবির বিষয়। যে সমাজ প্রশ্ন করতে ভুলে যায়, সে সমাজ ধীরে ধীরে নিজের অধিকারের সীমাও ভুলে যায়। তাই স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতার সংস্কৃতি গড়ে তোলার কাজটি রাষ্ট্র ও নাগরিক উভয়েরই। এই যৌথ দায়িত্ববোধই আগামী দিনের বাংলাদেশকে আরও সক্ষম ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলবে।


