
সড়কে প্রাণহানির খবর আমাদের দৈনন্দিন সংবাদপাঠের এমন এক নিয়মিত অংশ হয়ে গেছে যে অনেক সময় তা আর আলাদা করে নাড়া দেয় না। এই অভ্যস্ততাই সবচেয়ে উদ্বেগজনক লক্ষণ। প্রতিটি দুর্ঘটনার পেছনে থাকে একটি পরিবারের ভেঙে পড়া, একটি ভবিষ্যতের অকাল সমাপ্তি। অথচ আলোচনা সাধারণত কয়েক দিনের উত্তেজনায় সীমাবদ্ধ থেকে আবার স্তিমিত হয়ে যায়। আমরা মনে করি, সড়ক নিরাপত্তাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নয়, একটি কাঠামোগত জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে দেখার সময় এসেছে।
দোষারোপের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসা দরকার
দুর্ঘটনার পর সাধারণত চালকের দিকে আঙুল ওঠে। চালকের দায় অস্বীকার করার সুযোগ নেই, কিন্তু কেবল সেখানেই আলোচনা থেমে গেলে সমস্যার শিকড়ে পৌঁছানো যায় না। সড়কের নকশা, পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা, যানবাহনের কারিগরি অবস্থা, চালকের কর্মঘণ্টা ও প্রশিক্ষণের মান—এসব উপাদান মিলেই ঝুঁকির মাত্রা নির্ধারিত হয়।
নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থার মূল ধারণাটি সরল: মানুষ ভুল করবেই, কিন্তু সেই ভুল যেন মৃত্যুতে পরিণত না হয়, ব্যবস্থাটি সেভাবে গড়তে হবে। গতি নিয়ন্ত্রণ, পৃথক লেন, নিরাপদ পারাপার ও পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা—এসব কারিগরি সমাধান নতুন কিছু নয়। প্রয়োজন কেবল ধারাবাহিক প্রয়োগ ও রক্ষণাবেক্ষণের সদিচ্ছা।
আইন প্রয়োগের ধারাবাহিকতা
আইন থাকা আর আইন কার্যকর থাকা এক বিষয় নয়। মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে যে সাময়িক শৃঙ্খলা তৈরি হয়, তা টেকে না। কারণ সড়ক ব্যবহারকারীরা দ্রুত বুঝে যান কখন নজরদারি থাকে আর কখন থাকে না। ধারাবাহিক ও পক্ষপাতহীন প্রয়োগই কেবল আচরণে স্থায়ী পরিবর্তন আনতে পারে।
একই সঙ্গে প্রয়োজন যাচাইযোগ্য তথ্যভান্ডার। কোন এলাকায়, কোন সময়ে, কী ধরনের দুর্ঘটনা বেশি ঘটছে—এই তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ ও প্রকাশ করা গেলে হস্তক্ষেপ আরও লক্ষ্যভিত্তিক হতে পারে। তথ্যের অভাবে নীতিনির্ধারণ অনুমাননির্ভর হয়ে পড়ে, আর অনুমাননির্ভর নীতি সম্পদের অপচয় ঘটায়।
সংস্কৃতি বদলের দায় সবার
সড়ক নিরাপত্তা কেবল প্রশাসনের বিষয় নয়। চালক, যাত্রী, পথচারী, পরিবহন মালিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান—সবার আচরণ মিলে সড়কের সংস্কৃতি তৈরি হয়। শিশুদের ছোটবেলা থেকে ট্রাফিক নিয়ম শেখানো, কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ যাত্রার নীতি রাখা কিংবা তাড়াহুড়োকে বীরত্ব হিসেবে না দেখা—এসব ছোট পরিবর্তনই দীর্ঘমেয়াদে বড় ফল দেয়।
আমরা মনে করি, সড়কে প্রতিটি মৃত্যু প্রতিরোধযোগ্য ছিল—এই ধারণা থেকে আলোচনা শুরু হওয়া উচিত। ভাগ্য বা নিয়তির ব্যাখ্যা আমাদের দায়মুক্ত করে দেয়, আর সেই দায়মুক্তিই সংস্কারের সবচেয়ে বড় বাধা। নাগরিক হিসেবে আমাদের দাবি হওয়া উচিত স্পষ্ট ও ধারাবাহিক: নিরাপদে ঘরে ফেরা কোনো সৌভাগ্যের বিষয় নয়, এটি প্রত্যেকের ন্যূনতম অধিকার।


