
গত কয়েক দশকে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বৈশ্বিক উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, আর এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে চীনের শিল্পায়ন। কিন্তু চীনের নিজস্ব অর্থনৈতিক মডেলও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—রপ্তানি ও বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধি থেকে অভ্যন্তরীণ ভোগ ও প্রযুক্তিনির্ভর উৎপাদনের দিকে ঝোঁক স্পষ্ট হচ্ছে। এই স্থানান্তর কেবল একটি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়; এর প্রভাব পড়ছে গোটা অঞ্চলের সরবরাহ শৃঙ্খল ও বাণিজ্য কাঠামোর ওপর। বাংলাদেশসহ শ্রমঘন উৎপাদনে যুক্ত দেশগুলোর জন্য এতে সুযোগ ও ঝুঁকি—দুটোই নিহিত।
উৎপাদন কাঠামোর ধাপ পরিবর্তন
একটি অর্থনীতি যখন মজুরি স্তরে উঠে আসে, তখন কম মূল্য সংযোজনের শ্রমঘন উৎপাদন ধীরে ধীরে তুলনামূলকভাবে কম ব্যয়ের অঞ্চলে সরে যায়। উন্নয়ন অর্থনীতিতে এই প্রক্রিয়াকে দীর্ঘদিন ধরে উড়ন্ত হাঁসের সারির উপমায় ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যেখানে অগ্রবর্তী অর্থনীতি উচ্চতর ধাপে উঠে যায় এবং পেছনের দেশগুলো ছেড়ে যাওয়া জায়গা পূরণ করে। চীনের ক্ষেত্রে এই স্থানান্তর সম্পূর্ণ নয়, কারণ দেশটি একই সঙ্গে বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার, উন্নত অবকাঠামো ও গভীর উপকরণ সরবরাহ নেটওয়ার্ক ধরে রেখেছে।
এ কারণেই কারখানা স্থানান্তরের গতি অনেকের প্রত্যাশার চেয়ে ধীর। কেবল মজুরির পার্থক্য যথেষ্ট নয়; বন্দর দক্ষতা, বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্যতা, শুল্ক প্রক্রিয়ার গতি ও উপকরণের স্থানীয় প্রাপ্যতা মিলিয়ে যে সামগ্রিক ব্যয় দাঁড়ায়, ক্রেতারা সেটিই বিবেচনা করেন। যেসব দেশ এই সহায়ক ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করেছে, তারাই স্থানান্তরিত উৎপাদনের বড় অংশ আকর্ষণ করতে পেরেছে। বহু ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এখন ঝুঁকি ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল অনুসরণ করছে, অর্থাৎ একটি দেশ থেকে সম্পূর্ণ সরে না গিয়ে অতিরিক্ত উৎস যুক্ত করছে। এই প্রবণতা নতুন সরবরাহকারী দেশগুলোর জন্য প্রবেশের সুযোগ তৈরি করলেও প্রতিযোগিতাকে তীব্রতর করে তোলে, কারণ একাধিক দেশ একই সুযোগের জন্য দর কষাকষি করছে।
আঞ্চলিক মূল্য শৃঙ্খল ও প্রযুক্তি প্রতিযোগিতা
আধুনিক উৎপাদন একটি দেশে সম্পন্ন হয় না; একটি পণ্যের বিভিন্ন উপাদান একাধিক দেশে তৈরি হয়ে চূড়ান্ত সংযোজনের জন্য এক জায়গায় আসে। এই আঞ্চলিক মূল্য শৃঙ্খলে অংশ নিতে হলে একটি দেশকে নির্দিষ্ট ধাপে দক্ষতা অর্জন করতে হয়। সম্পূর্ণ পণ্য তৈরির সক্ষমতা না থাকলেও নির্ভরযোগ্য উপাদান সরবরাহকারী হিসেবে অবস্থান তৈরি করা সম্ভব, যা অনেক দেশের জন্য বাস্তবসম্মত প্রবেশপথ। এই ধরনের সংযুক্তির জন্য মান নিয়ন্ত্রণ, সময়মতো সরবরাহ এবং তথ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক সমন্বয়ের সক্ষমতা অপরিহার্য। আঞ্চলিক বাণিজ্য চুক্তিগুলোর উৎপত্তি বিধিও এখানে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কোন পণ্যকে কোন দেশের বলে গণ্য করা হবে তা এই বিধির ওপরই নির্ভর করে এবং তাতেই শুল্ক সুবিধা পাওয়ার যোগ্যতা নির্ধারিত হয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেমিকন্ডাক্টর, ব্যাটারি ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তিকে ঘিরে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। বৃহৎ অর্থনীতিগুলো কৌশলগত খাতে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে তোলার নীতি নিচ্ছে, যা বিশ্বায়নের আগের ধাপের তুলনায় একটি ভিন্ন প্রবণতা। এর ফলে দক্ষতা নয়, নিরাপত্তা ও স্থিতিস্থাপকতা সরবরাহ শৃঙ্খল নকশার নতুন বিবেচ্য হয়ে উঠেছে।
জনমিতি ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা
এশিয়ার একাধিক প্রধান অর্থনীতিতে বয়স্ক জনগোষ্ঠীর অনুপাত বাড়ছে, যা শ্রমশক্তি ও সামাজিক ব্যয়ের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি করবে। বিপরীতে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে তরুণ জনগোষ্ঠীর অনুপাত এখনো তুলনামূলকভাবে বেশি। এই জনমিতিক পার্থক্য আগামী দশকগুলোতে বিনিয়োগ প্রবাহ ও শ্রম অভিবাসনের ধরন নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তরুণ জনগোষ্ঠী নিজে থেকেই সুবিধা নয়; শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকলে এই সম্ভাবনা সামাজিক চাপে রূপ নিতে পারে। জনমিতিক লভ্যাংশ কাজে লাগানোর সময়সীমাও সীমিত, কারণ কয়েক দশকের মধ্যেই এসব দেশেও বয়স কাঠামো পরিবর্তিত হতে শুরু করবে।
অভ্যন্তরীণ ভোগের দিকে ঝোঁক বাড়লে আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য চীনের বাজারে রপ্তানির সুযোগও বিস্তৃত হতে পারে। তবে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে প্রয়োজন মানসম্মত পণ্য, ব্র্যান্ড উপস্থিতি ও বাজার সম্পর্কে গভীর জ্ঞান—যা প্রচলিত ঠিকাদারি উৎপাদনের অভিজ্ঞতা থেকে ভিন্ন দক্ষতা দাবি করে।
আর্থিক সংযোগও এই চিত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাত্রা। আঞ্চলিক উন্নয়ন ব্যাংক ও দ্বিপাক্ষিক ঋণব্যবস্থার মাধ্যমে অবকাঠামো অর্থায়নের বিকল্প উৎস তৈরি হয়েছে, যা গ্রহীতা দেশগুলোর জন্য সুযোগ ও ঝুঁকি দুটোই বহন করে। প্রকল্প নির্বাচনে যথাযথ সম্ভাব্যতা যাচাই, ঋণের শর্তে স্বচ্ছতা এবং পরিশোধ সক্ষমতার বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন না থাকলে অবকাঠামো বিনিয়োগ দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক চাপে রূপ নিতে পারে। এ কারণেই ঋণ ব্যবস্থাপনার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এখন উন্নয়ন কৌশলের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সামগ্রিকভাবে এশীয় অর্থনৈতিক ভূচিত্র একটি ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। যেসব দেশ অবকাঠামো, দক্ষতা ও নীতিগত পূর্বানুমেয়তায় বিনিয়োগ করবে, তারা এই পুনর্বিন্যাসে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে। বিপরীতে কেবল সস্তা শ্রমের ওপর ভরসা করে থাকা কৌশল ক্রমশ কম কার্যকর প্রমাণিত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।


