
জাতীয় বাজেট কেবল সরকারের আয় ও ব্যয়ের একটি বার্ষিক হিসাব নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের দলিল। কোন খাতে কত বরাদ্দ যাবে, কোথা থেকে অর্থ আসবে এবং ঘাটতি কীভাবে মেটানো হবে—এই তিনটি প্রশ্নের উত্তরেই ফুটে ওঠে সরকারের নীতিদর্শন। বাংলাদেশে বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়া অর্থবছর শুরুর বেশ কয়েক মাস আগেই শুরু হয় এবং এতে অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, পরিকল্পনা কমিশন ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় যুক্ত থাকে। তবে প্রক্রিয়াগত পরিপক্বতার পাশাপাশি বাস্তবায়নের ঘাটতি এবং রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনার কেন্দ্রে।
বাজেট তৈরির ধাপগুলো
সাধারণত অর্থবছরের মাঝামাঝি সময় থেকে মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো নিজেদের চাহিদাপত্র পাঠাতে শুরু করে। অর্থ বিভাগ সামষ্টিক অর্থনৈতিক কাঠামো নির্ধারণ করে—অর্থাৎ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য, মূল্যস্ফীতির প্রক্ষেপণ এবং ঘাটতির সহনীয় মাত্রা কত হবে তার একটি রূপরেখা দাঁড় করায়। এরপর মধ্যমেয়াদি বাজেট কাঠামোর আওতায় প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য ব্যয়সীমা নির্ধারিত হয়। উন্নয়ন বাজেট বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি আলাদাভাবে পরিকল্পনা কমিশনের মাধ্যমে চূড়ান্ত হয়, যদিও পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে সমন্বয়ের প্রশ্নটি এখনো পুরোপুরি মীমাংসিত নয়।
সংসদে বাজেট উত্থাপনের পর নির্দিষ্ট সময় ধরে সাধারণ আলোচনা চলে এবং অর্থ বিল পাসের মধ্য দিয়ে তা কার্যকর হয়। এই আলোচনায় করহার, শুল্ক কাঠামো ও ভর্তুকি নিয়ে ব্যবসায়ী সংগঠন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজের মতামত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে সমালোচকদের বড় অভিযোগ হলো, বাজেট প্রণয়নের পূর্ববর্তী পর্যায়ে অংশগ্রহণমূলক আলোচনার সুযোগ তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকে। প্রস্তাব চূড়ান্ত হওয়ার পর আলোচনা শুরু হলে মৌলিক কাঠামোগত পরিবর্তনের সুযোগ কার্যত থাকে না, ফলে বিতর্ক অনেক সময় নির্দিষ্ট করহার বা শুল্ক ছাড়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। উন্নত অনুশীলনে বাজেটপূর্ব শ্বেতপত্র প্রকাশ করে নীতিগত বিকল্পগুলো আগেভাগে জনসমক্ষে আনা হয়, যা সিদ্ধান্তের মান ও গ্রহণযোগ্যতা দুটোই বাড়ায়। স্থানীয় সরকার পর্যায়ে বরাদ্দ নির্ধারণেও একই ধরনের স্বচ্ছতার ঘাটতি লক্ষ করা যায়।
রাজস্ব আহরণের সীমাবদ্ধতা
বাংলাদেশের অর্থনীতির আকারের তুলনায় কর-জিডিপি অনুপাত দীর্ঘদিন ধরেই দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় নিচের দিকে অবস্থান করছে বলে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন। এর পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। প্রথমত, অর্থনীতির একটি বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে থাকায় করজালের বাইরে থেকে যায়। দ্বিতীয়ত, প্রত্যক্ষ করের তুলনায় পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরতা বেশি, যা কাঠামোগতভাবে কম প্রগতিশীল বলে বিবেচিত হয়। তৃতীয়ত, কর অব্যাহতি ও বিভিন্ন খাতভিত্তিক ছাড়ের কারণে সম্ভাব্য রাজস্বের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আদায় হয় না।
কর প্রশাসনের ডিজিটালকরণ এই সমস্যার একটি আংশিক সমাধান হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। অনলাইনে রিটার্ন দাখিল, স্বয়ংক্রিয় মূল্য সংযোজন কর ব্যবস্থাপনা এবং তথ্যভান্ডারগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করলে কর ফাঁকির সুযোগ কমে আসে। তবে প্রযুক্তি একা যথেষ্ট নয়; করদাতা ও কর কর্মকর্তার মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি না হলে স্বেচ্ছায় কর পরিশোধের সংস্কৃতি গড়ে ওঠে না। করদাতা কী সেবা পাচ্ছেন এবং তার পরিশোধিত অর্থ কোথায় ব্যয় হচ্ছে—এই প্রশ্নের দৃশ্যমান উত্তর থাকলে সম্মতির হার স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। পাশাপাশি করনীতি ও কর প্রশাসনকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে পৃথক রাখার প্রস্তাব দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে, যাতে নীতি প্রণয়নের সময় কেবল স্বল্পমেয়াদি আদায়ের লক্ষ্য প্রাধান্য না পায়। রাজস্ব ব্যবস্থার পূর্বানুমেয়তাও বিনিয়োগ সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, কারণ ঘন ঘন করকাঠামো পরিবর্তিত হলে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
ঘাটতি অর্থায়ন ও বাস্তবায়নের প্রশ্ন
রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের মধ্যে ব্যবধান পূরণে সরকারকে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নিতে হয়। ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া হলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণযোগ্য তহবিল সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়, যাকে অর্থনীতির ভাষায় ক্রাউডিং আউট বলা হয়। অন্যদিকে বৈদেশিক ঋণের ক্ষেত্রে সুদহার, পরিশোধের মেয়াদ এবং বিনিময় হারের ঝুঁকি বিবেচনায় নিতে হয়। তাই ঘাটতির পরিমাণের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে ঘাটতি অর্থায়নের গঠন।
বাজেট বাস্তবায়নের হারও একটি পুরনো দুর্বলতা। উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে অর্থবছরের শেষ প্রান্তিকে ব্যয় ঘনীভূত হওয়ার প্রবণতা কাজের মান ও অর্থের সদ্ব্যবহার—দুটোকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে। প্রকল্প প্রস্তুতির দুর্বলতা, ভূমি অধিগ্রহণে বিলম্ব এবং ক্রয়প্রক্রিয়ার জটিলতা এই ধীরগতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে আসছে।
সামনের দিনগুলোতে বাজেট আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু সম্ভবত আকার নয়, বরং গুণমান হয়ে উঠবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দের কার্যকারিতা, ভর্তুকির লক্ষ্যভিত্তিক বণ্টন এবং রাজস্ব ভিত্তির সম্প্রসারণ—এই তিনটি ক্ষেত্রেই অগ্রগতি ছাড়া টেকসই আর্থিক ব্যবস্থাপনা কঠিন। বাজেটকে যদি নিছক বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে না দেখে একটি জবাবদিহিমূলক নীতিদলিল হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তবেই এর প্রকৃত সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব।


