
এক সময় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য আলোচনার কেন্দ্রে ছিল সংক্রামক রোগ—ডায়রিয়া, যক্ষ্মা কিংবা ম্যালেরিয়ার মতো অসুখ। টিকাদান কর্মসূচি, বিশুদ্ধ পানি ও স্যানিটেশনের উন্নতির ফলে সেই চিত্র অনেকটাই বদলেছে। কিন্তু তার জায়গা নিয়েছে অন্য এক শ্রেণির অসুখ, যেগুলো ধীরে আসে এবং দীর্ঘদিন সঙ্গে থাকে—উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও ক্যানসার। এগুলোকে একসঙ্গে বলা হয় অসংক্রামক রোগ।
কেন এই পরিবর্তন
এই রূপান্তরের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। নগরায়ণের ফলে জীবনযাপনে শারীরিক পরিশ্রমের পরিমাণ কমেছে, খাদ্যাভ্যাসে প্রক্রিয়াজাত ও উচ্চ-ক্যালরি খাবারের অংশ বেড়েছে, আর তামাক ব্যবহার এখনও উল্লেখযোগ্য জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। একই সঙ্গে গড় আয়ু বাড়ায় জনসংখ্যার একটি বড় অংশ এখন সেই বয়সে পৌঁছাচ্ছে, যেখানে দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি স্বাভাবিকভাবেই বেশি।
বায়ুদূষণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বড় শহরগুলোতে দূষিত বাতাস শ্বাসতন্ত্রের রোগ ও হৃদরোগের ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ কেবল ব্যক্তিগত অভ্যাসের বিষয় নয়, এটি পরিবেশ ও নগর পরিকল্পনার প্রশ্নও বটে।
নীরব শুরু ও দেরিতে শনাক্তকরণ
অসংক্রামক রোগের একটি বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য হলো এগুলোর নীরব সূচনা। উচ্চ রক্তচাপ বছরের পর বছর কোনো স্পষ্ট উপসর্গ ছাড়াই চলতে পারে, অথচ এ সময়ে হৃৎপিণ্ড, কিডনি ও রক্তনালির ক্ষতি হতে থাকে। ডায়াবেটিসের ক্ষেত্রেও অনেক সময় জটিলতা দেখা দেওয়ার পরই রোগ ধরা পড়ে।
এ কারণেই নিয়মিত পরীক্ষা ও ঝুঁকি মূল্যায়নের গুরুত্ব বারবার আলোচিত হয়। পারিবারিক ইতিহাস, ওজন, ধূমপানের অভ্যাস ও শারীরিক নিষ্ক্রিয়তার মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করে চিকিৎসক নির্ধারণ করতে পারেন কার কখন কোন পরীক্ষা প্রয়োজন। উপসর্গহীন অবস্থায় শনাক্ত হলে চিকিৎসা তুলনামূলক সহজ ও ব্যয়সাশ্রয়ী হয়।
দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার বোঝা
দীর্ঘস্থায়ী রোগের চিকিৎসা একবারের ব্যাপার নয়; এতে নিয়মিত ফলোআপ, ওষুধ ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন জড়িত। বাংলাদেশে স্বাস্থ্যব্যয়ের বড় অংশ রোগীর নিজের পকেট থেকে যায় বলে দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা অনেক পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ তৈরি করে। এই চাপ থেকে অনেকে মাঝপথে চিকিৎসা বন্ধ করে দেন, যা জটিলতা বাড়ায়।
এখানে সতর্কতা জরুরি—ভালো বোধ করলেই ওষুধ বন্ধ করা কিংবা অন্যের পরামর্শে ওষুধ বদলে ফেলা মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। চিকিৎসা পরিকল্পনায় যেকোনো পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করেই।
সামনের দিনে অসংক্রামক রোগ মোকাবিলায় সাফল্য নির্ভর করবে প্রতিরোধ ও প্রাথমিক শনাক্তকরণের ওপর কতটা বিনিয়োগ হয় তার ওপর। হাসপাতালে শয্যা বাড়ানো প্রয়োজন, কিন্তু তার চেয়েও কার্যকর হতে পারে সেই নীতি, যা মানুষকে হাসপাতালে যাওয়ার আগেই ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।


