মূল কন্টেন্টে যান

বাংলার সাথে

অর্থনীতি ব্যবসা

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের অর্থায়ন সংকট কেন কাটছে না

ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের অর্থায়ন সংকট কেন কাটছে না

দেশের কর্মসংস্থান ও উৎপাদনের একটি বড় অংশের জোগান দেয় ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ, অথচ প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে এই খাতটিই সবচেয়ে বেশি বাধার মুখে পড়ে। জামানতের অভাব, হিসাবপত্রের অনানুষ্ঠানিকতা এবং ঋণ প্রক্রিয়ার জটিলতা—এই তিন কারণে অনেক উদ্যোক্তা শেষ পর্যন্ত অনানুষ্ঠানিক উৎস থেকে উচ্চ সুদে অর্থ সংগ্রহ করতে বাধ্য হন। ফলে ব্যবসা সম্প্রসারণের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও অনেক প্রতিষ্ঠান একই আকারে আটকে থাকে। এই কাঠামোগত সমস্যার সমাধান কেবল ঋণের পরিমাণ বাড়ানোর মধ্যে নেই, বরং ঋণ বিতরণের পদ্ধতিগত পরিবর্তনের মধ্যে নিহিত।

জামানতনির্ভর ঋণ ব্যবস্থার সীমা

প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ঋণ অনুমোদনের প্রধান ভিত্তি স্থাবর সম্পত্তি। একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার হাতে সাধারণত এমন সম্পত্তি থাকে না, বিশেষত যদি তিনি ভাড়া করা জায়গায় ব্যবসা পরিচালনা করেন কিংবা সেবাভিত্তিক খাতে কাজ করেন। নারী উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রে সমস্যাটি আরও তীব্র, কারণ পারিবারিক সম্পত্তির মালিকানা প্রায়শই তাদের নামে থাকে না। ফলে ব্যবসার সম্ভাবনা যত ভালোই হোক, ঋণ আবেদন প্রাথমিক পর্যায়েই আটকে যায়।

বিকল্প হিসেবে নগদ প্রবাহভিত্তিক ঋণ মূল্যায়নের কথা দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে জামানতের বদলে প্রতিষ্ঠানের বিক্রয়, লেনদেনের ধারাবাহিকতা ও সরবরাহ শৃঙ্খলে অবস্থান বিবেচনা করা হয়। ডিজিটাল লেনদেনের বিস্তার এই পদ্ধতিকে আগের চেয়ে বেশি বাস্তবসম্মত করে তুলেছে, কারণ মোবাইল আর্থিক সেবা ও ইলেকট্রনিক চালানের মাধ্যমে একজন উদ্যোক্তার আর্থিক আচরণের একটি যাচাইযোগ্য রেকর্ড তৈরি হয়। সরবরাহ শৃঙ্খলভিত্তিক অর্থায়নও একটি সম্ভাবনাময় মডেল, যেখানে একজন ক্ষুদ্র সরবরাহকারী বড় ক্রেতার নিশ্চিত ক্রয়াদেশকে ভিত্তি ধরে চলতি মূলধন পেতে পারেন। এতে ঝুঁকি মূল্যায়নের কেন্দ্রে থাকে লেনদেনের বাস্তবতা, ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানা নয়। তবে এসব পদ্ধতি কার্যকর করতে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ঋণনীতি ও কর্মীদের প্রশিক্ষণেও সমান্তরাল পরিবর্তন প্রয়োজন।

বিজ্ঞাপনখবরের মাঝে বিজ্ঞাপন

তথ্যঘাটতি ও ঝুঁকির ধারণা

ব্যাংকগুলোর দৃষ্টিকোণ থেকেও সমস্যাটি বোঝা প্রয়োজন। ছোট ঋণের ক্ষেত্রে প্রতি টাকায় প্রশাসনিক ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি, অথচ ঝুঁকি মূল্যায়নের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য কম। অনেক ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী থাকে না, ব্যক্তিগত ও ব্যবসায়িক হিসাব আলাদা থাকে না। এই তথ্যঘাটতিই ঝুঁকির ধারণাকে বাস্তবের চেয়ে বড় করে তোলে এবং ঋণের দাম বাড়িয়ে দেয়।

ঋণ তথ্য ব্যুরোর তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধ করা, ক্ষুদ্র উদ্যোগের জন্য সরলীকৃত হিসাব সংরক্ষণের মানদণ্ড প্রণয়ন এবং ঋণ নিশ্চয়তা তহবিলের কার্যকর ব্যবহার এই ব্যবধান কমাতে পারে। ঋণ নিশ্চয়তা ব্যবস্থা মূলত ঝুঁকির একটি অংশ ব্যাংকের কাঁধ থেকে সরিয়ে নেয়, ফলে জামানতহীন উদ্যোক্তার কাছে পৌঁছানো ব্যাংকের জন্য আর্থিকভাবে যুক্তিসংগত হয়ে ওঠে।

বাজারে টিকে থাকার অন্যান্য বাধা

অর্থায়নই একমাত্র সমস্যা নয়। ব্যবসা নিবন্ধন, লাইসেন্স নবায়ন ও কর সম্মতির প্রক্রিয়াগত জটিলতা অনেক উদ্যোক্তাকে আনুষ্ঠানিক খাতে আসতে নিরুৎসাহিত করে। অথচ আনুষ্ঠানিক নিবন্ধন ছাড়া ব্যাংক ঋণ, সরকারি প্রণোদনা কিংবা বৃহৎ ক্রেতার সঙ্গে চুক্তি—কোনোটিই সম্ভব নয়। এভাবে অনানুষ্ঠানিকতা ও অর্থায়ন সংকট একে অপরকে শক্তিশালী করে একটি দুষ্টচক্র তৈরি করে।

একই সঙ্গে ব্যবস্থাপনাগত দক্ষতা, বাজার সম্পর্কে তথ্য এবং পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা অনেক প্রতিষ্ঠানের বৃদ্ধিকে সীমিত করে রাখে। প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ সেবা এখানে ঋণের মতোই গুরুত্বপূর্ণ, যদিও নীতি আলোচনায় বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম মনোযোগ পায়। বিশেষত ডিজিটাল বিপণন, মজুত ব্যবস্থাপনা ও মূল্য নির্ধারণের প্রাথমিক কৌশল সম্পর্কে ধারণা থাকলে অনেক প্রতিষ্ঠান একই পুঁজি দিয়েই বেশি আয় করতে পারে। বাজার সংযোগও একটি বড় প্রশ্ন—ক্ষুদ্র উৎপাদকরা প্রায়ই একাধিক মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে পণ্য বিক্রি করতে বাধ্য হন, ফলে চূড়ান্ত মূল্যের একটি সামান্য অংশই তাদের হাতে পৌঁছায়। যৌথ ক্রয়, সাধারণ সুবিধা কেন্দ্র বা ক্লাস্টারভিত্তিক উদ্যোগ এই ব্যবধান কমাতে সহায়ক হতে পারে।

নীতিগত দিক থেকে আরেকটি প্রশ্ন হলো সরকারি ক্রয়ে ক্ষুদ্র উদ্যোগের অংশগ্রহণ। সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্রয়াদেশ একটি বিশাল ও নিশ্চিত বাজার, কিন্তু দরপত্রের কঠিন শর্ত, উচ্চ জামানত ও বিলম্বিত অর্থ পরিশোধের কারণে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলো এতে অংশ নিতে পারে না। বহু দেশে নির্দিষ্ট অনুপাতের ক্রয় ক্ষুদ্র উদ্যোগের জন্য সংরক্ষিত রাখার নীতি অনুসরণ করা হয়, যা তাদের জন্য একটি স্থিতিশীল আয়ের উৎস তৈরি করে। বিল পরিশোধের সময়সীমা কঠোরভাবে মেনে চলাও এ ক্ষেত্রে সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সামগ্রিকভাবে দেখলে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগকে অর্থনীতির প্রান্তিক অংশ হিসেবে না দেখে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচনা করার প্রয়োজন রয়েছে। ঋণপ্রাপ্তির পদ্ধতি সহজ করা, ডিজিটাল তথ্যের ভিত্তিতে ঝুঁকি মূল্যায়ন এবং নিয়ন্ত্রক আনুষ্ঠানিকতা হ্রাস—এই তিন দিকে সমান্তরাল অগ্রগতি হলে এই খাতের সুপ্ত সম্ভাবনা অনেকাংশে উন্মোচিত হতে পারে। আর তা হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির চাপ কেবল কয়েকটি বড় শিল্পের ওপর নির্ভর করে থাকবে না।

admin

লেখক সম্পর্কে

সম্পর্কিত খবর

আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর কৌশলগত প্রশ্ন
অর্থনীতি রেমিট্যান্স

আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর কৌশলগত প্রশ্ন

  • ১৮ জুলাই, ২০২৬
প্রবাসী আয় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম নির্ভরযোগ্য উৎস এবং লাখো পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের ভিত্তি। রপ্তানি আয়ের মতো এটি আমদানি ব্যয়ের
জাতীয় বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়া ও রাজস্ব কাঠামোর কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতি বাজেট

জাতীয় বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়া ও রাজস্ব কাঠামোর কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ

  • ১৮ জুলাই, ২০২৬
জাতীয় বাজেট কেবল সরকারের আয় ও ব্যয়ের একটি বার্ষিক হিসাব নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের দলিল। কোন খাতে কত