মূল কন্টেন্টে যান

বাংলার সাথে

বিশ্লেষণ রাজনীতি

রাজনৈতিক মেরুকরণ কীভাবে নীতিনির্ধারণকে দুর্বল করে

রাজনৈতিক মেরুকরণ কীভাবে নীতিনির্ধারণকে দুর্বল করে

বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতার তীব্রতা নতুন কিছু নয়, তবে গত কয়েক দশকে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা ক্রমশ এমন এক রূপ নিয়েছে যেখানে প্রতিপক্ষকে কেবল ভিন্নমতাবলম্বী নয়, বরং বৈধতাহীন প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার প্রবণতা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় এই অবস্থাকে বলা হয় তীব্র রাজনৈতিক মেরুকরণ। এর প্রভাব কেবল সংসদ বা রাজপথে সীমাবদ্ধ থাকে না; প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পেশাজীবী সংগঠন এমনকি পারিবারিক ও সামাজিক সম্পর্কেও তা ছড়িয়ে পড়ে। এই লেখায় মেরুকরণের কার্যকারণ ও তার নীতিগত অভিঘাত বিশ্লেষণের চেষ্টা করা হয়েছে।

মেরুকরণের কাঠামোগত উৎস

মেরুকরণের প্রথম উৎস নিহিত থাকে বিজয়ীর সবকিছু পাওয়ার নির্বাচনী কাঠামোয়। যেখানে ক্ষমতায় গেলে নীতিনির্ধারণ, নিয়োগ ও সম্পদ বণ্টনের প্রায় সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ পাওয়া যায় এবং হারলে প্রায় কিছুই থাকে না, সেখানে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা অস্তিত্বের লড়াইয়ে রূপ নেয়।

দ্বিতীয় উৎস ঐতিহাসিক স্মৃতি ও জাতীয় পরিচয়ের ব্যাখ্যা নিয়ে বিদ্যমান বিরোধ। অর্থনৈতিক নীতির বিরোধ সাধারণত আপসযোগ্য—করহার বা ভর্তুকির মাত্রা নিয়ে মধ্যপথ বের করা সম্ভব। কিন্তু পরিচয় ও ইতিহাসের প্রশ্নে মধ্যপথ খুঁজে পাওয়া কঠিন, কারণ এখানে বিষয়টি প্রায়ই নৈতিক ও আবেগীয় স্তরে চলে যায়।

বিজ্ঞাপনখবরের মাঝে বিজ্ঞাপন

প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষয়

মেরুকরণের সবচেয়ে ক্ষতিকর দিকটি হলো স্বাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এর প্রভাব। যখন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে দুই শিবিরের কোনো একটির অনুগত বলে ধরে নেওয়া হয়, তখন সেই প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষ সিদ্ধান্তও একপক্ষীয় বলে বিবেচিত হয়। ফলে প্রশাসন, নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, বিচারব্যবস্থা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয় হতে থাকে।

এই ক্ষয়ের একটি বাস্তব ফল হলো নীতির অস্থিরতা। সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে পূর্ববর্তী সরকারের নেওয়া দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প ও নীতি পুনর্বিবেচনার প্রবণতা দেখা যায়। অথচ অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য বা জলবায়ু অভিযোজনের মতো ক্ষেত্রে ফল পেতে দশক লেগে যায়। রাজনৈতিক ধারাবাহিকতার অভাবে এসব খাতে বিনিয়োগের প্রতিদান পুরোপুরি পাওয়া যায় না।

গণমাধ্যম, তথ্যপরিসর ও নাগরিক

তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার মেরুকরণকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম সাধারণত ব্যবহারকারীকে তার পূর্বধারণার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কনটেন্ট দেখায়, ফলে প্রত্যেকে নিজের মতের প্রতিধ্বনি শুনতে থাকেন। ভিন্নমতের সঙ্গে বাস্তব সংলাপের সুযোগ কমে যায় এবং প্রতিপক্ষ সম্পর্কে কল্পিত ও চরমপন্থী ধারণা তৈরি হয়।

এই পরিস্থিতিতে পেশাদার সাংবাদিকতার ভূমিকা বাড়ে। তথ্য যাচাই, প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা এবং বিভিন্ন পক্ষের বক্তব্য সমানভাবে উপস্থাপন—এই মৌলিক কাজগুলো করা গেলে জনআলোচনার মান বজায় রাখা সম্ভব। তবে গণমাধ্যম নিজেই যখন শিবিরভুক্ত হিসেবে চিহ্নিত হয়, তখন এই ভূমিকা পালন কঠিন হয়ে পড়ে।

মেরুকরণ কমানোর কোনো একক সমাধান নেই, তবে অভিজ্ঞতা বলে কিছু পথ কার্যকর হতে পারে। সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণ, স্বাধীন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বদলীয় সম্মতির প্রক্রিয়া, স্থানীয় সরকারে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ এবং নির্দিষ্ট কয়েকটি জাতীয় ইস্যুতে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা—এসব ব্যবস্থা প্রতিযোগিতাকে ধ্বংসাত্মক হওয়া থেকে বিরত রাখতে পারে। গণতন্ত্রের শক্তি মতভেদ দূর করায় নয়, বরং মতভেদকে সহনীয় ও উৎপাদনশীল রাখার প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতায়।

admin

লেখক সম্পর্কে

সম্পর্কিত খবর

গণআন্দোলন কীভাবে গড়ে ওঠে এবং কেন ব্যর্থ হয়
আন্দোলন রাজনীতি

গণআন্দোলন কীভাবে গড়ে ওঠে এবং কেন ব্যর্থ হয়

  • ১৯ জুলাই, ২০২৬
রাজপথের আন্দোলন বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি স্থায়ী উপাদান। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে স্বৈরাচারবিরোধী লড়াই, শ্রমিকদের মজুরি আন্দোলন কিংবা শিক্ষার্থীদের
নির্বাচনী প্রচারে দলীয় কৌশলের বদলে যাওয়া ধরন
নির্বাচন রাজনীতি

নির্বাচনী প্রচারে দলীয় কৌশলের বদলে যাওয়া ধরন

  • ১৯ জুলাই, ২০২৬
নির্বাচন কেবল ভোটগ্রহণের দিনটির নাম নয়; এর আগে দীর্ঘ সময় ধরে চলা প্রচার, সংগঠন ও যোগাযোগের প্রক্রিয়াই মূলত ফলাফল নির্ধারণে