মূল কন্টেন্টে যান

বাংলার সাথে

অর্থনীতি ব্যাংকিং

খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংক খাতে সুশাসনের প্রশ্ন

খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা ও ব্যাংক খাতে সুশাসনের প্রশ্ন

আর্থিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা মূলত নির্ভর করে ব্যাংকগুলোর সম্পদের গুণমানের ওপর। যখন বিতরণ করা ঋণের একটি বড় অংশ নির্ধারিত সময়ে ফেরত আসে না, তখন ব্যাংকের মুনাফা, মূলধন ভিত্তি এবং নতুন ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা—তিনটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও শ্রেণিকৃত ঋণের ব্যবস্থাপনা ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে আলোচিত নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। এই সমস্যার শিকড় কেবল অর্থনৈতিক নয়, প্রাতিষ্ঠানিক ও আইনি কাঠামোর মধ্যেও প্রোথিত।

ঋণ শ্রেণীকরণ আসলে কী বোঝায়

একটি ঋণকে তখনই শ্রেণিকৃত বলা হয় যখন নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কিস্তি বা সুদ পরিশোধিত হয় না। মেয়াদভেদে এগুলো নিম্নমান, সন্দেহজনক ও মন্দ ঋণে বিভক্ত হয় এবং প্রতিটি স্তরের বিপরীতে ব্যাংককে নির্দিষ্ট হারে নিরাপত্তা সঞ্চিতি বা প্রভিশন রাখতে হয়। এই সঞ্চিতি মুনাফা থেকেই আসে, ফলে খেলাপি ঋণ বাড়লে ব্যাংকের বিতরণযোগ্য আয় কমে যায়। বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীর আস্থার ওপরও এর সরাসরি প্রভাব পড়ে।

তবে হিসাবের পদ্ধতি নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। পুনঃতফসিলকরণ বা ঋণ পুনর্গঠনের মাধ্যমে অনেক সময় একটি সমস্যাগ্রস্ত ঋণ কাগজে-কলমে নিয়মিত দেখানো সম্ভব হয়। এতে তাৎক্ষণিকভাবে পরিসংখ্যান স্বস্তিদায়ক দেখালেও অন্তর্নিহিত ঝুঁকি রয়ে যায়। এ কারণে বিশ্লেষকরা কেবল ঘোষিত হারের বদলে চাপগ্রস্ত সম্পদের বিস্তৃত চিত্র দেখার পরামর্শ দেন। পুনঃতফসিলকরণ নিজে দোষণীয় নয়—সাময়িক নগদ প্রবাহ সংকটে পড়া একটি কার্যক্ষম ব্যবসাকে সময় দেওয়া অর্থনৈতিকভাবে যুক্তিসংগত। সমস্যা তৈরি হয় তখনই, যখন এই সুবিধা কাঠামোগতভাবে অকার্যকর প্রকল্পের ক্ষেত্রেও বারবার প্রয়োগ করা হয় এবং ক্ষতি স্বীকারের সিদ্ধান্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়।

বিজ্ঞাপনখবরের মাঝে বিজ্ঞাপন

সুশাসন ও ঋণ অনুমোদনের সংস্কৃতি

খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ তৈরি হয় ঋণ অনুমোদনের পর্যায়েই। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যথাযথভাবে যাচাই না করে, ঋণগ্রহীতার পূর্ব ইতিহাস উপেক্ষা করে কিংবা প্রভাবশালী মহলের চাপে ঋণ অনুমোদিত হলে পরবর্তী ধাপে আদায় কঠিন হয়ে পড়ে। পরিচালনা পর্ষদের ভূমিকা এখানে নির্ণায়ক। পর্ষদ যদি কৌশলগত তদারকির বদলে দৈনন্দিন ঋণ সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করে, তবে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হয়।

এ কারণেই আন্তর্জাতিক অনুশীলনে স্বতন্ত্র পরিচালক, শক্তিশালী নিরীক্ষা কমিটি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় পৃথক জবাবদিহি কাঠামোর ওপর জোর দেওয়া হয়। পাশাপাশি ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনগুলোর ওপর কার্যকর ফলোআপ না হলে সতর্কসংকেত অকার্যকর হয়ে পড়ে। ঋণ ঘনীভবনের ঝুঁকিও কম আলোচিত একটি দিক—যখন কয়েকটি বৃহৎ গ্রাহক বা একটি নির্দিষ্ট খাত ব্যাংকের ঋণ পোর্টফোলিওর অসামঞ্জস্যপূর্ণ বড় অংশ দখল করে রাখে, তখন সেই খাতের একটি বিপর্যয় গোটা প্রতিষ্ঠানকে টালমাটাল করে দিতে পারে। এ কারণেই একক গ্রাহক ঋণসীমা ও খাতভিত্তিক সীমা মেনে চলার তদারকি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আইনি প্রক্রিয়া ও আদায়ের বাস্তবতা

ঋণ আদায়ের জন্য অর্থঋণ আদালতের মাধ্যমে মামলা করার ব্যবস্থা থাকলেও দীর্ঘসূত্রতা একটি বড় বাধা। মামলার জট, উচ্চ আদালতে স্থগিতাদেশ এবং জামানত সম্পত্তির প্রকৃত বাজারমূল্য নিয়ে জটিলতার কারণে আদায় প্রক্রিয়া বছরের পর বছর ঝুলে থাকতে পারে। এই বিলম্ব ইচ্ছাকৃত খেলাপির জন্য এক ধরনের প্রণোদনা তৈরি করে, কারণ সময়ক্ষেপণের খরচ তুলনামূলকভাবে কম।

বিকল্প হিসেবে সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের ধারণা বিভিন্ন দেশে পরীক্ষিত হয়েছে। এই মডেলে ব্যাংক তার সমস্যাগ্রস্ত ঋণ একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠানের কাছে হস্তান্তর করে নিজের ব্যালান্স শিট পরিচ্ছন্ন করে এবং ওই প্রতিষ্ঠান পুনরুদ্ধারে মনোযোগ দেয়। তবে এর সাফল্য নির্ভর করে স্বচ্ছ মূল্যায়ন পদ্ধতি ও শক্তিশালী আইনি সহায়তার ওপর, নইলে সমস্যা কেবল স্থানান্তরিত হয়, সমাধান হয় না।

ব্যাংক খাতের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির তালিকায় নতুন কিছু উপাদানও যুক্ত হচ্ছে। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের বিস্তারের সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষা কেন্দ্রীয় বিষয়ে পরিণত হয়েছে, কারণ একটি বড় নিরাপত্তা লঙ্ঘন আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি আস্থার সংকটও তৈরি করতে পারে। একই সঙ্গে জলবায়ুজনিত ঝুঁকি ঋণ পোর্টফোলিওর ওপর কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে, সে বিষয়ে মূল্যায়ন কাঠামো তৈরির আলোচনা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এগিয়ে যাচ্ছে। বন্যা বা লবণাক্ততার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় বিতরণ করা কৃষি ও ক্ষুদ্র ঋণের আদায়যোগ্যতা এই ধরনের বিশ্লেষণের একটি বাস্তব উদাহরণ।

সব মিলিয়ে ব্যাংক খাতের স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের পথটি একমুখী নয়। কঠোর ও ধারাবাহিক তদারকি, ঋণ শ্রেণীকরণে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের অনুসরণ, আইনি প্রক্রিয়ার গতি বৃদ্ধি এবং পর্ষদ পর্যায়ে প্রকৃত জবাবদিহি—এই উপাদানগুলো একসঙ্গে কাজ না করলে সাময়িক ছাড় বা পুনঃতফসিলের সুবিধা দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমাধান আসবে না। আমানতকারীর আস্থা একবার ক্ষুণ্ন হলে তা পুনরুদ্ধারে যে সময় ও ব্যয় লাগে, তা যেকোনো সংস্কারের খরচের চেয়ে অনেক বেশি।

admin

লেখক সম্পর্কে

সম্পর্কিত খবর

আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর কৌশলগত প্রশ্ন
অর্থনীতি রেমিট্যান্স

আনুষ্ঠানিক চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানোর কৌশলগত প্রশ্ন

  • ১৮ জুলাই, ২০২৬
প্রবাসী আয় বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার অন্যতম নির্ভরযোগ্য উৎস এবং লাখো পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয়ের ভিত্তি। রপ্তানি আয়ের মতো এটি আমদানি ব্যয়ের
জাতীয় বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়া ও রাজস্ব কাঠামোর কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ
অর্থনীতি বাজেট

জাতীয় বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়া ও রাজস্ব কাঠামোর কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ

  • ১৮ জুলাই, ২০২৬
জাতীয় বাজেট কেবল সরকারের আয় ও ব্যয়ের একটি বার্ষিক হিসাব নয়, এটি একটি রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকারের দলিল। কোন খাতে কত