মূল কন্টেন্টে যান

বাংলার সাথে

আন্তর্জাতিক মধ্যপ্রাচ্য

তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বৈচিত্র্যকরণের পথে মধ্যপ্রাচ্য

তেলনির্ভর অর্থনীতি থেকে বৈচিত্র্যকরণের পথে মধ্যপ্রাচ্য

মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক পরিচয় দীর্ঘদিন ধরে হাইড্রোকার্বন সম্পদের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। তেল ও গ্যাস রপ্তানি থেকে প্রাপ্ত আয় এই অঞ্চলের রাষ্ট্রীয় ব্যয়, সামাজিক কল্যাণ কর্মসূচি এবং অবকাঠামো উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু জ্বালানি বাজারের চক্রাকার ওঠানামা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি রূপান্তরের দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা এই মডেলের টেকসইতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। ফলে অঞ্চলের একাধিক দেশ অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যকরণকে জাতীয় কৌশলের কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

সম্পদনির্ভরতার কাঠামোগত ঝুঁকি

একক প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অতিনির্ভরতাকে উন্নয়ন অর্থনীতিতে প্রায়ই সম্পদের অভিশাপ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। রপ্তানি আয়ের প্রাচুর্য মুদ্রার মান শক্তিশালী রাখে, যা অন্যান্য রপ্তানিমুখী শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমিয়ে দেয়। একই সঙ্গে রাষ্ট্রীয় রাজস্বের বড় অংশ সম্পদ খাত থেকে আসায় কর ব্যবস্থার বিকাশ ধীর হয় এবং নাগরিক ও রাষ্ট্রের মধ্যে রাজস্বভিত্তিক জবাবদিহির সম্পর্ক দুর্বল থেকে যায়।

দামের অস্থিরতা আরেকটি বড় ঝুঁকি। যখন আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম নিম্নমুখী থাকে, তখন রাষ্ট্রীয় বাজেটে চাপ পড়ে এবং উন্নয়ন প্রকল্প স্থগিত করতে হয়। এই অনিশ্চয়তা মোকাবিলায় অনেক দেশ সার্বভৌম সম্পদ তহবিল গঠন করেছে, যার উদ্দেশ্য সুসময়ের উদ্বৃত্ত সঞ্চয় করে দুঃসময়ে ব্যবহার করা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্পদ সংরক্ষণ করা। এসব তহবিলের কার্যকারিতা নির্ভর করে স্পষ্ট বিনিয়োগ নীতিমালা, পেশাদার ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ থেকে দূরত্ব বজায় রাখার সক্ষমতার ওপর। যেখানে এই শর্তগুলো পূরণ হয়েছে, সেখানে তহবিল প্রকৃত অর্থেই সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করেছে।

বিজ্ঞাপনখবরের মাঝে বিজ্ঞাপন

বৈচিত্র্যকরণের কৌশল ও বাস্তবতা

বৈচিত্র্যকরণের প্রচেষ্টায় পর্যটন, লজিস্টিকস, আর্থিক সেবা, উচ্চশিক্ষা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ দৃশ্যমান হয়েছে। ভৌগোলিক অবস্থান এই অঞ্চলকে ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়ার মধ্যে পুনঃরপ্তানি ও পরিবহন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সুযোগ দিয়েছে। প্রচুর সূর্যালোক থাকায় সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনেও তুলনামূলক সুবিধা রয়েছে, যা ভবিষ্যতে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রপ্তানির সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।

তবে বৈচিত্র্যকরণের একটি বড় চ্যালেঞ্জ শ্রমবাজার কাঠামো। রাষ্ট্রীয় খাতে তুলনামূলকভাবে আকর্ষণীয় বেতন ও সুবিধা থাকায় স্থানীয় নাগরিকদের বেসরকারি খাতে আকৃষ্ট করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের একটি বড় অংশ অভিবাসী শ্রমিকনির্ভর। এই দ্বৈত শ্রমবাজার সংস্কার না করে টেকসই বেসরকারি খাতভিত্তিক প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন বলে বিশ্লেষকরা মনে করেন।

অভিবাসী শ্রম ও আঞ্চলিক সংযোগ

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বহু দেশের জন্য এই অঞ্চল প্রধান শ্রমবাজার হিসেবে বিবেচিত। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক নীতি পরিবর্তন—তা সে স্থানীয়করণ নীতি হোক কিংবা নতুন খাতে জনবল চাহিদা—প্রেরক দেশগুলোর শ্রম অভিবাসন ও প্রবাসী আয়ের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। নির্মাণ খাতের বাইরে স্বাস্থ্যসেবা, আতিথেয়তা, লজিস্টিকস ও কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষ জনবলের চাহিদা বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

এই পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হলে প্রেরক দেশগুলোকে প্রশিক্ষণ ও সনদায়ন ব্যবস্থার মানোন্নয়নে মনোযোগ দিতে হবে। কেবল শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যা নয়, দক্ষতার স্তরই ভবিষ্যতে নির্ধারণ করবে কে কতটা সুযোগ পাবে। পারস্পরিক সনদ স্বীকৃতি সংক্রান্ত সমঝোতা এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে কার্যকর হতে পারে। অভিবাসন ব্যয় হ্রাস এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ উচ্চ অভিবাসন ব্যয় শ্রমিকের প্রকৃত আয়ের একটি বড় অংশ প্রথম কয়েক বছরেই শুষে নেয়। প্রেরক ও গ্রহীতা দেশের মধ্যে স্বচ্ছ নিয়োগ কাঠামো গড়ে তোলা তাই কেবল মানবিক নয়, অর্থনৈতিক যুক্তিতেও সমর্থনযোগ্য।

পানি ও খাদ্য নিরাপত্তা এই অঞ্চলের আরেকটি দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ। শুষ্ক জলবায়ু ও সীমিত মিঠাপানির উৎসের কারণে কৃষি উৎপাদনের সুযোগ সংকুচিত, ফলে খাদ্যের বড় অংশ আমদানিনির্ভর। বিশ্ববাজারে খাদ্যপণ্যের দামের ওঠানামা তাই সরাসরি অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতিতে প্রতিফলিত হয়। এই ঝুঁকি মোকাবিলায় লবণমুক্তকরণ প্রযুক্তি, নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে চাষ এবং বিদেশে কৃষি বিনিয়োগের মতো বিভিন্ন কৌশল অনুসরণ করা হচ্ছে, যদিও প্রতিটিরই নিজস্ব ব্যয় ও পরিবেশগত প্রশ্ন রয়েছে।

সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক রূপান্তর একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া, যার ফলাফল এক দশকে পুরোপুরি দৃশ্যমান হবে না। জ্বালানি আয়ের ওপর নির্ভরতা রাতারাতি কমানো সম্ভব নয়, কিন্তু সেই আয়কে কীভাবে ভবিষ্যতের উৎপাদনশীল সক্ষমতায় রূপান্তরিত করা হচ্ছে—সেটিই মূল প্রশ্ন। এই রূপান্তরের গতি ও সাফল্য কেবল অঞ্চলটির নয়, তার সঙ্গে শ্রম ও বাণিজ্যে যুক্ত বহু দেশের ভবিষ্যৎকেও প্রভাবিত করবে।

admin

লেখক সম্পর্কে

সম্পর্কিত খবর

চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তর ও এশীয় সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবর্তন
আন্তর্জাতিক চীন ও এশিয়া

চীনের অর্থনৈতিক রূপান্তর ও এশীয় সরবরাহ শৃঙ্খলের পরিবর্তন

  • ১৯ জুলাই, ২০২৬
গত কয়েক দশকে পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া বৈশ্বিক উৎপাদনের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে, আর এই রূপান্তরের কেন্দ্রে রয়েছে চীনের শিল্পায়ন। কিন্তু
যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা বিভাজন ব্যবস্থা যেভাবে নীতি নির্ধারণ করে
আন্তর্জাতিক আমেরিকা

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা বিভাজন ব্যবস্থা যেভাবে নীতি নির্ধারণ করে

  • ১৯ জুলাই, ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বাইরের পর্যবেক্ষকদের কাছে প্রায়ই বিভ্রান্তিকর মনে হয়, কারণ সেখানে ক্ষমতা কোনো একক কেন্দ্রে পুঞ্জীভূত নয়। সাংবিধানিক নকশাতেই